Ticker

6/recent/ticker-posts

Ads

নিম পাতার ২৬টি জাদুকরী উপকারিতা

নিম পাতার উপকারিতা ও বিভিন্ন অংশের উপকারি দিক :

নিম এমন একটি ঔষধি গাছ যার ডাল, পাতা, রস সব কিছু কাজে লাগে। নিম বহুবর্ষজীবী ও চিরহরিৎ জাতীয় বৃক্ষ। ভারতীয় উপমহাদেশে ঔষধি গাছ হিসেবে নিমের ব্যবহার হয়ে আসছে গত ৫ হাজার বছর ধরে। প্রকৃতি কী করে এক সঙ্গে সমস্যা ও সমাধান ধারণ করে রেখেছে তার আশ্চর্যজনক উদাহরণ হলো নিম (neem)।

নিমগাছে আছে ১৩০টি ঔষধি গুণগুন। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া নাশক হিসেবে নিম খুবই কার্যকর এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এর জুড়ি মেলা খুবই ভার। চলুন জানা যাক, নিম বা নিম পাতার জাদুকরী উপকারিতা এবং বিভিন্ন অংশের উপকারি দিক সম্পর্কে।

নিম পাতার উপকারিতা
নিম পাতার উপকারিতা

নিম বা নিম পাতার জাদুকরী উপকারিতা :

১. চুলকানি বা খোস পাচড়া

নিম পাতা সিদ্ধ করে সেই সিদ্ধ জল দিয়ে গোসল করলে খোস পাচড়া দূর হয়ে যায়। নিমের পাতা কিংবা ফুল পেস্ট করে গায়ে মধ্যে কয়েকদিন লাগালে চুলকানি রোগ দূর হয়ে যায়। ভিজানো পাতা গুঁড়ো করে সরিষার তেলের সাথে মিশ্রণ করে চুলকানির জায়গায় লাগালে জাদুর মতো কাজ করে। 

আবার নিম পাতার + কাঁচা হলুদ পেস্ট করে নিয়ে আক্রান্ত স্থানে প্রলেপ মতো লাগালে ৭-৯ দিন ব্যবহার করলে চুলকানি ও পুরনো ক্ষত দূর হয়ে যায়। নিম পাতা ঘি মধ্যে ভিজে সেই পাতা ক্ষত স্থানে লাগালে ক্ষত অতি তাড়াতাড়ি আরোগ্য হয়।

২. কৃমিনাশক

পেটের মধ্যে কৃমি হলে শিশুরা রোগাক্রান্ত হয়ে যায়। পেটে বড় হয় বা ফুলে যায় ও চেহারা ফ্যকাশে মতো হয়ে যায়। শিশুদের কৃমি নির্মূল করতে নিম পাতার জুড়ি নেই।
শিশুরা বেশি এই রোগে আক্রান্ত হয়। 

এজন্য ৫০ মি.লি. পরিমাণ নিমের মূল ছালের গুঁড়া দিনে ৩ বার সামান্য গরম জল দিয়ে খেতে হবে। আবার ৪-৫ গ্রাম নিমের ছাল গুঁড়া সামান্য লবণসহ সকালে খালি পেটে খেলে কৃমির উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তার জন্য পুরো সপ্তাহ সেবন করে যেতে হব। শিশুদের ক্ষেত্রে ১-২ গ্রাম মাত্রায় সেব্য।

৩. ত্বক

প্রচীনতম কাল থেকেই রূপচর্চায় নিমের ব্যবহার হয়ে আসছে। ত্বকের যত্নে নিম পাতার উপকারিতা অনেক। ত্বকের দাগ ও ব্রণ দূর করতে, ত্বকের ময়েশ্চারাইজার হিসেবে নিম(neem) খুবই কার্যকার।

ঘরে তৈরী নিমের বড়িও খাওয়া যেতে পারে। বড়ি তৈরিতে নিম পাতা ভালো করে ধুয়ে পেস্ট করে নিন। হাতে মাধ্যমে ছোট ছোট বড়ি তৈরী করুন। বড় ফ্যানের বাতোসে একদিন রেখে দিন। পরদিন রোদে শুকাতে দিন। তারপর এয়ারটাইট বয়ামে সংরক্ষণ করুন। নিম পাতা ত্বকের সুরক্ষায় খুবই বেশি কার্যকারী।

ব্রণের সংক্রমণ হলেই নিমপাতা পেস্ট করে লাগালে ভালো ফল পাওয়া যায়। মাথার ত্বকে চুলকানি কমাতে, নিম পাতার রস খুবই কার্যকারী। প্রতিদিন নিম পাতার + সামান্য কাঁচা হলুদ পেস্ট করে ত্বকে লাগালে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ার পাশাপাশি স্কিন টোন ঠিক হয়। 

যদি হলুদ ব্যবহার করেন তাহলে রোদ এড়িয়ে চলাই ভালো। নিমপাতা সিদ্ধ করে গোসলের জলের সাথে মিশিয়ে নিন। এটি ব্যবহারের যাদের চুলকানি আছে তাদের আরাম হবে এবং গায়ে দুর্গন্ধ কমে যাবে।

আরও পড়ুন। ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির উপায়

আজীবন যৌবন ধরে রাখবে যে ১৫ টি খাবার

৪. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

কয়েকটি নিমপাতা চুর্ণ করে ১ গ্লাস পানির সাথে মিশিয়ে দৈনিক সকালে পান করলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণে বাড়ে।

৫. দাঁতের রোগ

নিম পাতা (Neem leaves) ও ছালের গুঁড়া বা নিমের ডাল দিয়ে নিয়মিত দাঁত মাজলে দাঁত হয়ে উঠবে মজবুত, রক্ষা পাবেন দন্ত বিভিন্ন রোগ থেকেও। 

নিম পাতার রস জলে মিশিয়ে দাঁত আলতোভাবে ধুঁয়ে ফেললে দাঁতের আক্রমণ, পচন, রক্তপাত ও মাড়ির ব্যথা কমে যাবে এবং বুকে কফ জমে গেলে নিম পাতা পেস্ট করে জলের সাথে মিশিয়ে দিনে তিন থেকে চারবার খেলে অনেক উপকার পাওয়া যায়।

৬. রক্তের সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে

নিম ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বিস্ময়কর কাজ করে। নিম পাতার রক্তের সুগার লেভেল কমতে সহায়তা করে। পাশাপাশি রক্ত নালীকে প্রসারিত করে রক্ত সংবহন উন্নত করে। সকালে খালি পেটে গোলমরিচ ও নিম পাতা পেস্ট করে খেলে ডায়াবেটিস কমাতে সাহায্য করে।

৭. চুল

উজ্জ্বল,সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন চুল পেতে নিম পাতার অবদান অপরিসীম। চুলের খুসকি দূর করতে নিম পাতার রস খুবই কার্যকারী। সপ্তাহে ১ দিন  নিমপাতা ভালো করে বেটে চুলে লাগিয়ে ঘণ্টার খানিক রাখুন। 

এবার ঘন্টা খানিক পর ভালো করে ধুয়ে ফেলুন। ফলে চুল পড়া কমার পাশাপাশি চুল নরম ও কোমল হবে। চুলে আরও অনেক উপকারিতা রয়েছে। 

৮. উকুন দূর হয়

নিমের ব্যবহার ফলে উকুনের সমস্যা দূর হয়। নিমের পেস্ট তৈরি করে মাথার মাখুন, তারপর মাথায় শ্যাম্পু করে ধুয়ে ফেলুন ও উকুনের চিরুনি দিয়ে মাথা আঁচড়ান। সপ্তাহে ৩ বার ২ মাস এভাবে করুন। ফলে উকুন দূর হয়ে যাবে।

৯. খুশকি দূর হয়

নিমের Bacteria and fungi নাশক উপাদানের জন্য খুশকি দূর হয়। নিম মাথার তালুর শুষ্কতা ও চুলকানি দূর করে দেয। ৪ কাপ জলে ১ মুঠো নিম পাতা দিয়ে গরম করতে হবে যতক্ষণ না জলটা সবুজ আকার ধারণ করে।

এই জল ঠান্ডা হলে চুল শ্যাম্পু করার পর জল দিয়ে চুল ধুয়ে নিন। নিমের এই জল কন্ডিশনারের মতো কাজ করে। সপ্তাহে ২-৩ বার ব্যবহার করুন যতদিন পর্যন্ত না খুশকি দূর হয়ে যায়।

১০. ওজন কমাতে

ওজন কমাতে নিমের ফুলের জুস খেতে হবে। নিম ফুল মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে শরীরের চর্বি ভাঙ্গতে সহায়তা করে। ১ মুঠো নিম ফুল চূর্ণ করে এর সাথে ১ চামুচ মধু এবং আধা চামুচ লেবুর রস দিয়ে ভালো করে মিশান। 

দৈনিক সকালে খালি পেটে এই মিশ্রণটি পান করুন। এই মিশ্রণটি ওজন কমাতে সহায়তা করে। 

১১. রক্ত পরিষ্কার করে

নিম পাতার রস রক্ত পরিষ্কার করে ও শর্করার মাত্রা কমায়। পাশাপাশি রক্ত চলাচল বাড়িয়ে হৃৎপিণ্ডের গতি স্বাভাবিক রাখে। নিমের পাতা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও রক্ষা করে।

১২. পোকা-মাকড়ের কামড়

পোকা-মাকড় কামড়ালে বা হুল ফোঁটালে নিমের শিকড় বা পাতা বেটে ক্ষত স্থানে লাগালে ব্যথা উপশম বা দূর হয়।

১৩. জন্ডিস

জন্ডিস হলে নিয়মিত সকালে নিম পাতার রস সাথে
মধু মিশিয়ে খালি পেটে খেতে হবে। ২৫-৩০ ফোঁটা নিম পাতার রসের সাথে মধু মিশিয়ে সকালে খালি পেটে খেলে জন্ডিস থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। জন্ডিস নিরাময়ের জন্য ১ সপ্তাহ চালিয়ে যেতে হবে।

১৪. ভাইরাস রোগ

ভারতীয় উপমহাদেশে ভাইরাস রোগ নিরাময়ে নিম (neem) ব্যবহৃত হয়। নিম পাতার রস ভাইরাস নিরাময় করে। প্রাচীনকাল থেকে চিকেন পক্স, হাম ও অন্য চর্মরোগ হলে নিমপাতা বাটা বা পেষ্ট লাগানো হতো। 

আবার নিমপাতা জল সিদ্ধ করে সে জল দিয়ে স্নান বা গোসল করলে ত্বকের জ্বালাপোড়া ও চুলকানি দূর হয়ে যায়।

১৫. ম্যালেরিয়া

নিম পাতার জল সিদ্ধ করে সেই জল ঠাণ্ডা করে স্প্রে বোতলে রাখুন। দৈনিক ঘরে স্প্রে করলে মশার উপদ্রব একেবারেই কমে যাবে।

১৬. বাত

নিমপাতা বাতের ব্যথা সারাতে ঔষুধ হিসেবে কাজ করে। বাতের ব্যথায় নিমের তেল ম্যাসেজ হিসেবে অনেক উপকারি। 

১৭. চোখ

চোখে চুলকানি হলে নিমপাতা জল ১০ মিনিট সিদ্ধ করে ভালোভাবে ঠাণ্ডা করে নিন। চোখে সেই জল ঝাপটা দিন। তারপর আরামবোধ করবেন।

১৮. ব্রণ দূর হয়

নিমপাতার গুঁড়ো জলে মিশিয়ে মুখ ধুঁতে পারেন। এতে করে ব্রণ সমস্যা দূর হবে ও ব্রণের তৈরী জ্বালাপোড়া ভাবও একেবারেই দূর হবে। এটা ব্রণ দূর করার কার্যকরী পদ্ধতি।

আরও পড়ুন। মুখের ব্রণ দূর করার ঘরোয়া উপায়

ব্রণের দাগ দূর করার উপায় 

১৯. ক্ষত নিরাময়ে

নিমপাতা ক্ষত নিরাময়েও বেশী উপকারী। নিমপাতা বেটে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে রাখবেন। ফলে দ্রুত ক্ষত নিরাময় হবে। 

২০. অজীর্ণ

পাতলা পায়খানা হলে ২৫-৩০ ফোঁটা নিম পাতার রস, অর্ধেক কাপ জল সঙ্গে মিশিয়ে সকাল-বিকাল খাওয়ালে অনেক উপকার পাওয়া যাবে।

২১. অ্যালার্জি

অ্যালার্জির সমস্যা হলে নিম পাতা ভালোভাবে ফুটিয়ে স্নান করুন। অ্যালার্জি যাবে ১০০ গজ দূরে। তাছাড়া কাঁচা হলুদ সাথে নিম পাতা বেঁটে শরীরে লাগালে অ্যালার্জি কমে যাবে।

২২. একজিমা

একজিমা, ফোঁড়া ও বিভিন্ন ধরনের ত্বকের সমস্যা নিরাময়ে নিম খুবই কার্যকর। ত্বকের আক্রান্ত জায়গায় সমস্যা হলে সেখানে নিমপাতা বেটে লাগাতে পারেন।

২৩. ক্যান্সার

নিমের তেল, বাকল ও পাতার নির্যাস ব্যবহারে ফলে ক্যান্সার-টিউমার, স্কীন ক্যান্সার প্রভৃতি ভালো হয়।

২৪. বমি

বমি হলে নিম পাতার রস ৪-৫ ফোঁটা সাথে দুধ মিশিয়ে খেলে বমি উপশম হয়। 

২৫. রাতকানা

নিমের ফুল ভাজা খেলে রাতকানা রোগ থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

২৬. বসন্ত

কাঁচা হলুদের সাথে নিম পাতা পেস্ট বসন্তের গুটিতে দিলে গুটি বা বসন্ত দ্রুত শুকিয়ে যায়।

নিমের বিভিন্ন অংশের উপকারি দিক :

পাতা

নিম পাতার যে উপকারি তা আমরা কমবেশি সবাই জানি। নিম পাতার অসাধারণ ও জাদুকারী সব গুণ রয়েছে। পাশাপাশি পাতা, ফল, ছাল, বীজ ইত্যাদি এক কথায় নিমের সমস্ত অংশ ব্যবহার করা যায়।

নিম গাছের পাতা, শিকড়, নিম ফল ও বাকল ওষুধের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে বিশ্বে নিমের কদর কারণ অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে ব্যবহারের জন্য।

ছাল

নিমের ছালে Immunomodulatory Polysaccharide Compound আছে – যা শরীরের অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সহায়তা করে৷ ফলে অর্থাক্রোগ প্রতিরোগ ক্ষমতা বাড়বে৷

নিমের তেল

নিম তেলটির চড়া গন্ধ৷ নিমের তেল লাল রঙের হয়। এতে ট্রাইগ্লিসারাইড, ট্রাইটারপিনয়েড ইত্যাদি যৌগ আছে৷ কীটনাশক এমনই এক যৌগ৷ এতে এসেনশিয়াল ফ্যাটি অ্যাসিড আছে৷ 

চামড়ার প্রদাহ কমাতে নিমতেল খুবই কাজে লাগে৷ নিমতেল গর্ভনিরোধন হিসেবে ব্যবহার করা হয়৷

নিম চা

অর্ধেক কাপ তাজা নিমপাতার উপর ফোটানো গরম জল ঢেলে নিন৷ মাএ ৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন৷ তারপর ভালোভাবে ছেঁকে নিন৷ ধীরে ধীরে সেই জল পান করুন৷ এতে জ্বর-সর্দি কমবে, রক্তের সুগার মাএা কমবে৷ 

ব্লাডারের সমস্যা, জন্ডিস, পেটে কৃমি, ম্যালেরিয়া, চামড়ার ইত্যাদি রোগ ভালো হয়ে যাবে৷ নিমের চা ক্ষত বা চোটের আঘাত সরাতে সাহায্য করে। 

নিম দাঁতন

নরম নিম ডালের দাঁতন গ্রামীণ বা গ্রামে এখনও চলে৷ পাশাপাশি শহরে ও মফস্‌সলেও৷ নিম মাড়ির স্বাস্থ্য সুস্থ-সবল রাখে৷ দাঁতের অসুখ-বিসুখ ও সংক্রমণ থেকে মুক্ত রাখে৷

সুতরাং, নিম পাতার জাদুকরী উপকারিতা ও নিমের বিভিন্ন অংশের উপকারি দিক সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারলেন। ফলে নিমের উপকারিতা ও ব্যবহারগুলি আপনার প্রত্যাহিক জীবনে অবশ্যই কাজে আসবে এবং এগুলি আপনি দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করবেন। 

আমাদের জানাবেন নিমের কোন ব্যবহার আপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়েছে, কমেন্টবক্সে মধ্যে Comment করতে ভুলবেন না।

আরও পড়ুন। মধুর উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম

করোনাকালে নিম পাতা খাওয়া গুরুত্ব ও উপকারিত



Post a Comment

1 Comments

Don't Share Any Link